
মেয়েটা বকুলতলায় বসে ফুল কুড়োচ্ছিল। পরনে একটা নীল পেড়ে কমলা শাড়ি। একটু দূরে দাঁড়িয়ে অর্ক দেখছিল মেয়েটাকে। মুখটা দেখা যাচ্ছেনা, খোঁপাটাও একটু আলগা করে বাঁধা। যার ফলে একটু ঝুঁকে বসায় খোঁপাটা সরে এসে ঢেকে দিয়েছে মুখের বামপাশটা। ভারি মিষ্টি মেয়েটার বসার ভঙ্গিটা। নীল আঁচলটা কোলের মাঝে নিয়ে বাম হাতে আলতো করে সেটা ধরে রেখেছে সে। আর ডান হাতে পরম ভালোবাসায় কুড়িয়ে নিচ্ছে ঘাসের ওপর ছড়িয়ে থাকা বকুল ফুলগুলো। হাত দু’টি ভারী সুন্দর। একটু রোগা, তবে সেই রোগা ভাবটা হাতের সৌন্দর্য কমাচ্ছে না, বরং বাড়িয়ে দিচ্ছে যেন! অর্ক অবাক হয়ে খেয়াল করলো, মেয়েটার হাতের সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে একজোড়া শাঁখা-পলা। মেয়েটা বিবাহিতা!
‘কার জন্য বকুল কুড়োচ্ছে সে? প্রিয়তম স্বামীর জন্য? রাতের বেলা বুঝি চুপটি করে স্বামীর বালিশের ওপর ছড়িয়ে দেবে সে ফুলগুলো?’ এসব কথা কথা মাথা থেকে বের করার চেষ্টা করে অর্ক। আবারো মনোযোগ দেয় মেয়েটার দিকে। মেয়েটার বসার ভঙ্গিটা খুব চেনা। ঠিক এভাবেই বসে একজন বকুল কুড়োত এখান থেকে। মেয়েটাকে দেখে মনে হচ্ছে, ঠিক যেন লক্ষ্মী বসে বকুল কুড়োচ্ছে!
লক্ষ্মী! তার লক্ষ্মী! হ্যাঁ, সেইতো এভাবে বসে বকুল কুড়োত। তারা দু’জন কোন এক শান্ত বিকেলে এখানে এসে বসতো, ঠিক ঐ বকুল গছটার নিচে, লক্ষ্মী বসতো গছের গোড়ায় হেলান দিয়ে। তখন লক্ষ্মীর কোলে মাথা রেখে অর্ক শুয়ে পড়তো নরম ঘাসের ওপর। লক্ষ্মী তার সুন্দর আঙ্গুলগুলো দিয়ে বিলি কেটে দিত অর্কর মাথায়। মাঝে মাঝে একটু ঝুকে কপালে একটা চুমো দিত। তরপর... অর্ক লক্ষ্মীর মাথাটা টেনে নিত কাছে। খুনসুটিতে তারা পার করত বেশ খানিকটা সময়। হঠ্যাৎ কোথাও একটা শব্দ- তারা দু’জন সচকিত হয়ে সামলে নিত নিজেদের। লক্ষ্মী তাগাদা দিতো, ‘এই, অনেক দেরি হয়ে যাচ্ছে কিন্তু, এবার উঠবে না?’ খানিকটা গড়িমসি করে অর্ক উঠতো, লক্ষ্মীর হতটা ধরে টান দিয়ে বলতো, ‘চলো, যাই।’ লক্ষ্মী তখন আস্তে করে হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে বলতো, ‘একটু দাঁড়াও না! কত্তগুলো বকুল ফুল সামনে পড়ে আছে, ক’টা কুড়িয়ে নিয়ে যাই...’ বলেই ব্যস্ত হয়ে পড়তো বকুল কুড়োতে, ঠিক ওভাবে... যেভাবে ওই মেয়েটা কুড়োচ্ছে...।
চমক ভাঙ্গলো অর্কর। মেয়েটার বকুল কুড়োনো শেষ! তার আর লক্ষ্মীর বকুলতলায় বকুল কুড়োনো শেষ করেছে মেয়েটা।
লক্ষ্মী বলতো, ‘জানোতো, এই গাছটা না আমাদের জন্য অপেক্ষা করে থাকে। কি সুন্দর ফুলের গালিচা বানিয়ে রাখে আমাদের জন্য! আমি-তুমি সেই গালিচায় বসি, ফুলও নিয়ে যায়। একদিনও এই বকুলগাছ আমায় খালি হাতে ফিরতে দিয়েছে বলো?’
তখন সে লক্ষ্মীর চিবুকটা ধরে পরম ভালোবাসায় বলেছে, ‘বকুলগাছটাও যে আমার অপরূপা লক্ষ্মীর পেমে পড়ে গেছে গো! ভারী হিংসে হয় আমার ওকে!’
লক্ষ্মী তখন কপট রাগে বলেছে, ‘হ্যাঁ, তুমি হিংসে করা ছাড়া আর কিছু করতে জানো নাকি?’
‘জানি না?’
‘একটুও না!’
‘বেশ, দাড়াও, দেখাচ্ছি আমি কিছু জানি কি না...!’ বলেই সে লক্ষ্মীকে বাহুডোরে জড়িয়ে টেনে নিত নিজের মাঝে। ভালোবাসায় সিক্ত হতো দুজনে। কিছুক্ষণ পরে তৃপ্ত মুখটা লুকোত লক্ষ্মী অর্কর বুকের মাঝে। হঠ্যাৎ যেন নিজের বুকে লক্ষ্মীর স্পর্শ অনুভব করলো অর্ক। অস্ফুটে মুখ থেকে বেরিয়ে এলো ‘লক্ষ্মী!’
কোথায় লক্ষ্মী? কোথাও তো নেই সে।
মেয়েটার দিকে আবার তাকায় অর্ক। মেয়েটা কি করে যেন বারবার তাকে আকর্ষণ করছে! কি অদ্ভুত! মেয়েটার খোঁপা খুলে গেছে। মুখের বাম পাশটা সম্পূর্ণ ঢেকে গিয়ে চুল গড়াচ্ছে মেয়েটার কোলের ওপর। সে এখন বসে বসে মালা গাঁথছে। সুঁই-সুতো নিয়েই এসেছিলো নাকি? মেয়েটাকে ভীষণ রহস্যময়ী মনে হয় অর্কর। ইচ্ছে করে ছুটে গিয়ে মেয়েটাকে বলে, ‘এত সাহস কেন তোমার? কে তুমি? আমার লক্ষ্মীর জায়গা কেন নিচ্ছ তুমি?’
আশ্চর্য! মেয়েটা বসেছেও লক্ষ্মীর মতো করে। আচ্ছা, লক্ষ্মী কি তবে ফিরে এসেছে? না, না! সে কি করে ফিরে আসবে? একটুখানি এগোয় অর্ক। আবার থামে। আবার এগোয়। লক্ষ্মীর জায়গা সে অন্য কাউকে কেন দেবে? ওখানে, ওই বকুলতলাতে শুধু লক্ষ্মী-ই বসবে, ফুল কুড়োবে, মালা গাঁথবে।
অন্যকেউ কেন বসবে সেখানে? বৃন্দাও তো জানে জায়গাটার কথা। আসতেও চেয়েছে কতবার। কই, সে তো বৃন্দাকে আনেনি এখানে। আর সপ্তাহখানেক পরে বৃন্দা তার স্ত্রী হবে, তবুও তো অর্ক বৃন্দাকে এই বকুলতলার ঠিকানা দেয়নি। কেনই বা দেবে? এ জায়গাটা শুধু লক্ষ্মীর। শুধু তার লক্ষ্মীর। একদিন এক পুকুরপাড়ে বসে একে অন্যকে অনেকটা ভালোবেসেছিল ওরা। তখন অর্কর জীবনে বৃন্দা ছিলনা। অর্কর সবটুকু জুড়ে তখন একজনই। তাকে বুকে জড়িয়ে রেখেছিলো অর্ক। অনেকটা সময়। তারপর সে যখন মুখ তুলল, খুব ধীরে, অর্কর বুকের ভেতর থেকে, এক নজর দেখেই অর্ক তার কপালের নীল টিপটার প্রেমে পড়ে গিয়েছিল! তার গাল দু’টো আলতো ধরে অর্ক বলেছিলো, ‘তুমি আমার লক্ষ্মীটি’। সে মৃদু হেসে অর্কর চোখে চোখ রেখে বলেছিল, ‘লক্ষ্মীটি না গো, লক্ষ্মী। শুধু তোমার লক্ষ্মী...’।
শেষ ক’টা দিন ওই নামটাই আঁকড়ে ছিলো সে। লক্ষ্মী। অর্কর লক্ষ্মী। এখন তার কি হয়েছে,তা অর্ক জানে না। লক্ষ্মী কোথায় আছে, কেমন আছে, কিছুই সে জানে না।
মেয়েটা গাছের গোড়ায় হেলান দিয়ে বসে মালা গাঁথছে। একরাশ কালো চুলের আড়াল তাকে আরোও রহস্যবৃতা করে তুলেছে। অর্ক আরও একটু এগোয়। হাতে থাকা বিয়ের কার্ডটা আরও একটু শক্ত করে ধরে সে। তাকায় কার্ডটার দিকে। তার আর বৃন্দার বিয়ের কার্ড। বৃন্দাকে সে চেনে অনেকদিন ধরে। বৃন্দা তাকে খুব ভালোবাসে, এটা সে জানে। আচ্ছা, বৃন্দা কি তাকে লক্ষ্মীর থেকেও বেশি ভালোবাসে? কিন্তু সে তো বৃন্দাকে ভালোবাসে না। সে ভালোবাসত লক্ষ্মীকে। এখনো ভালোবাসে। তবে বৃন্দার কাছে সে কৃতজ্ঞ। বৃন্দা তাকে নতুন জীবন দিয়েছে। বেঁচে থাকার ইচ্ছে ফিরিয়ে দিয়েছে, যে ইচ্ছেটা কি না চলেগিয়েছিল লক্ষ্মীর সাথে সাথেই...!
বিয়ের কার্ডটা সে বাড়ি নিয়ে যাচ্ছে। সবাইকে দেখাতে হবে। ডিজাইনটা বৃন্দার পছন্দে নেওয়া হয়েছে। বাড়িতে দেখিয়ে বৃন্দার কাছে নিয়ে যেতে হবে কার্ডটা। কিন্তু বাড়ি ফেরার পথে এই বকুরতলার ডাক যে অর্ক উপেক্ষা করতে পারলো না। কে যেন তাকে ডাকলো, ‘এসো, অর্ক... এসো... একবারটি দেখে যাও!’
দেখতেই তো এসছিল সে। তার লক্ষ্মীর জায়গাটা দেখতে এসেছিল সে। কিন্তু এই মেয়েটা তার লক্ষ্মীর জায়গাটা দখল করে বসে আছে। আবারো মনের ভেতরে কে যেন বিদ্রোহ করে ওঠে, ‘না! এ জায়গাটা শুধুই লক্ষ্মীর। আর কারো না.. আর কারো না... কখ্খনো না!’
শেষ বিদায়ের দিনটাও তো অর্ক আর লক্ষ্মী এই বকুলতলাতেই কাটিয়েছে। সেদিন লক্ষ্মী একটা লাল-হলুদ শাড়ি পরেছিলো। লক্ষ্মী কখনো এক রঙা শাড়ি পরতো না রঙের প্রতি লক্ষ্মীর ভালোবাসাটাই ছিল অন্যরকম। শেষ দিনটাতেও এই বকুল তলাতেই বসেছিল ওরা। তবে মুখোমুখি। একে অন্যকে ভালোবেসেছিল অনেকটা। লক্ষ্মীর হাত দু’টো অর্ক টেনে নিয়েছিল নিজের হাতের মধ্যে। তার অস্থিরতা দেখে অভয়ের হাসি হেসে লক্ষ্মী বলেছিল, ‘তুমি এমন করছো কেন গো? মামাতো বনের বিয়েতেই যাচ্ছি তো, নিজের বিয়েতে না! বিয়েটা মিটে গেলেই আমি ফিরে আসবো। তোমায় খবর দিলে আমার সাথে এই বকুলতলায় এসে দেখা করো, কেমন?’
মাথা নেড়ে সায় দিয়ে লক্ষ্মীকে দু’হাতে জড়িয়ে ওর বুকে মুখ লুকিয়েছিল অর্ক। অস্ফুটে শুধু বলেছিলো, ‘আমার কাছে আবার ফিরে এসো লক্ষ্মী..।’ লক্ষ্মীও তার মাথায় একটা চুমো খেয়ে বলেছিলো, ‘আসবো তো অর্ক। আবার তোমার কাছেই ফিরে আসবো।’
মিথ্যে বলেছিলো লক্ষ্মী। সে তো আর ফিরে আসেনি। অনেকদিন অপেক্ষার পর লক্ষ্মীর এক বান্ধবীর কাছে সে খবর পেয়েছিল, তার লক্ষ্মীর নাকি বিয়ে হয়ে গেছে! প্রথমটাই নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারেনি সে। ‘তার লক্ষ্মী এখন অন্য কারো স্ত্রী! তার লক্ষ্মী!’ সে তখন পাগলের মতো খুঁজেছিল তার লক্ষ্মীকে। অনেক চেষ্টার পরে একদিন লক্ষ্মীর ছোট বোনটার সাথে যখন সে দেখা করলো, তখন মেয়েটা তাকে বললো, ‘দিদি বিয়ে করতে চায়নি। সম্ভবত তোমাদের বিষয়টা আমাদের পরিবারে জানাজানি হয়ে গিয়েছিল। হঠ্যাৎ করেই বাবা আমাদের মামাতো বোনের বিয়ের আসরেই দিদির বিয়ে দিয়ে দেন। দিদি আমাকে বলেছিলো তোমার কথা। খুব কষ্ট পেয়েছে দিদি। খুব কষ্ট পেয়েছে...’ অর্কর দু’চোখে তখন নিকষ আঁধার। পায়ের নিচ থেকে মাটিটা যেন সরে যাচ্ছিল ওর। একবারও জিজ্ঞেস করা হলো না, লক্ষ্মী কোথায় আছে?
‘কেন এমন হলো? লক্ষ্মীর সিঁথিতে তো আমারই সিঁদুর পরাবার কথা ছিলো। তবে?’ নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করে অর্ক, ‘লক্ষ্মী তো শুধু আমারই লক্ষ্মী, তাই না? তাহলে কেন এমন হলো? কেন লক্ষ্মী অন্য কারো হয়ে গেল?’
হঠ্যাৎ খেয়াল হতে অর্ক দেখে, ওর গাল দু’টো ভিজে গিয়েছে! সামনেই তো আছে সেই বকুল গাছ। ‘আজ এসব কথা কেন ভাবছি আমি? কি হবে এসব ভেবে?’
‘লক্ষ্মী তো আর ফিরে আসবেনা। ও তো এখন অন্য কারো ঘর আলো করে আছে। আচ্ছা, ওর স্বামী ওকে কি বলে ডাকে?’ জানতে বড় ইচ্ছে করে অর্কর... হঠ্যাৎ বৃন্দার মুখটা ভেসে ওঠে অর্কর চোখে। প্রচন্ড এক চাবুক খায় সে! ‘এসব আমি কি ভাবছি? আমি এখনো লক্ষ্মীর কথা ভাবছি জানলে তো বৃন্দা কষ্ট পাবে।’
ফিরে যাওয়ার জন্য পা বাড়িয়েও থমকে দাঁড়ায় অর্ক। ‘কী এমন ক্ষতি হবে এখন লক্ষ্মীর কথা ভাবলে? চুপি চুপি যদি আমি সারাটা জীবন ওকে ভালোবেসে যাই, দোষ কী তাতে? ভালোবাসা কি পাপ নাকি?’ ঘাড় ঘুরিয়ে সে ফিরে তাকায় বকুল তলায় বসে থাকা মেয়েটার দিকে। এখনো একমনে মালা গাঁথছে সে। তার দিকে বেশ খানিকটা এগোয় অর্ক। মেয়েটা টের পায়না। এখনো মেয়েটার মুখ দেখা যাচ্ছে না। অথচ সে মেয়েটার বেশ কাছেই দাঁড়িয়ে আছে। হঠ্যাৎ মেয়েটা চমকে উঠে সুঁই-সুতো আর অর্ধেক গাঁথা মালাটা ফেলে দেয় হাত থেকে। ‘কি হলো হলো মেয়েটার?’ বাম হাতের একটা আঙ্গুল চেপে ধরে ঝুঁকে পড়ে মেয়েটা।
‘ইস্! বেচারির বোধহয় আঙ্গুলে সুঁই ফুটে গেছে।’ মেয়েটা ঝুকে পড়েছে অনেকটা। একটু ফোঁপাচ্ছে। তার শরীরের কেঁপে কেঁপে ওঠা দেখে টের পাওয়া যাচ্ছে বিষয়টা। ‘মেয়েটার নিশ্চয় খুব যন্ত্রণা হচ্ছে..’ ভাবে অর্ক। পায়ে পায়ে এবার সে এসে দাঁড়ায় মেয়েটার সামনে। নরম গলায় জানতে চায়, ‘আপনার কি খুব লেগেছে?’ জবাবে মেয়েটা ধীরে ধীরে মুখ তুলে তাকায় অর্কর দিকে।
সেই সুগঠিত কপাল, সেই ঘন কালো দু’টি চোখ। সেই আরক্ত কপোল, একটুখানি চাপা নাক, ভীরু দুটি ঠোঁট, আর... আর ঠোঁটের ডান পাশে একটা ছোট্ট তিল। এতো সেই মুখ!
ভয়ানক চমকে ওঠে অর্ক। কার্ডটা পড়ে যায় ওর হাত থেকে। এ যে সেই লক্ষ্মী! সিঁথিতে কেবল একটা রক্তিম রেখা, তাছাড়া সব এক!
‘লক্ষ্মী... তুমি!’ উত্তেজনায় তখন কাঁপছে অর্ক। অর্কর দিকে একভাবে চেয়ে, শান্তমুখে একটা আলতো হাসি ফুটিয়ে, লক্ষ্মী ধীর গলায় জিজ্ঞেস করে, কেমন আছো অর্ক?
aanzumzeba@gmail.com

অসাধারণ সুন্দর লাগলো
ReplyDeleteখুব সুন্দর হয়েছে
ReplyDelete