Tuesday, May 24, 2016

সেই আষাঢ়ের গোয়েন্দারা

আসিফ   আদিত্য ঘুট-ঘুটে অন্ধকার। তার মাঝ দিয়ে হাঁটছে আমাদের বালকদের একটি দল। কার আগে কে যেতে পারে, এই আমাদের প্রতিযোগিতা। আমাদের সবার ... thumbnail 1 summary
আসিফ আদিত্য

ঘুট-ঘুটে অন্ধকার। তার মাঝ দিয়ে হাঁটছে আমাদের বালকদের একটি দল। কার আগে কে যেতে পারে, এই আমাদের প্রতিযোগিতা। আমাদের সবার গন্তব্য গোঁসাইদের আম বাগান। সন্ধ্যা বেলা আচমকা কাল বৈশাখী ঝড়।
সবার যখন মুখ কালো তখন আমাদের বালকদের নাচানাচি দেখে কে! আর তখনি  আমাদের ছোট দলটা ছুট দিলো আম বাগানের দিকে। কোথাও বিশ্রাম নেওয়ার ফুসরত নেই । বাগানটাও আনেক দূরে। আবার থেকে থেকে বাজ পড়ছে। পথ ভাঙ্গা ডালপালা আর ঝোপঝাড়ে ভরা। তার উপর কাঁচা রাস্তা পিচ্ছিল হয়ে আছে। ঠিকভাবে হাঁটা পর্যন্ত মুশকিল হয়ে পড়ছে।
অনেকটা সময় লাগলো আমাদের সেখানে পৌঁছাতে। গিয়ে দেখি অনেকে এর আগেই পৌছে গেছে আম বাগানে। আবার অনেকে এর মধ্যেই আমের বোঝা কাঁধে নিয়ে ফিরে যাচ্ছে বাড়ির দিকে। কিন্তু এত বড় বাগানে আম এর অভাব হবে কেন? বলা যায় আম এর উপর গড়াগড়ি। যাই হোক আম কুড়িয়ে আমরা বাড়ির পথ ধরলাম। কিন্তু পথে ঘটলো বিপত্তি। আকাশের পায়ে বাবলা কাঁটা ফু্টল। আমাকে আর মিতুলকে চেংদোলা করে বয়ে নিতে হলো আকাশকে। তার উপর কাঁধে আম এর বোঝা। কতটা সময় হাঁটলাম জানি না। অনেকটা পথ হাঁটার পর লক্ষ করলাম, গ্রাম এর মেঠো পথ ছেড়ে কখন যেন আমরা জঙ্গলের পথে হাঁটা ধরেছি। হঠাৎ করে আমাদের ভয় করতে শুরু করলো। আর এরই মধ্যে আমরা বনের প্রায় মধ্যখানে চলে এসেছি। ফিরতেও অনেকটা সময় লেগে যাবে, আর জঙ্গলে পথ চেনা দুষ্করই নয় বরং প্রায় অসম্ভবও বটে। তার মধ্যে আবার আকাশ ঘনকালো মেঘে ছেয়ে আছে।
তাহলে কি আজ আমরা বাড়ি ফিরতে পারবো না? এরই মধ্যে আমাদের দলের বাকি তিন ক্ষুদে সদস্য কেঁদে ফেলেছে। আমি ওদের বুঝালাম, আল্লাহ্‌ আমাদের সহায় হবেন। ওরা বললো, ভাইয়া এই দিকের রাস্তাটা নাকি খুব খারাপ, মা বলেছে।
আমিও এই ভয় পাচ্ছিলাম, কিন্তু বেশি ভয় পেলেও সমস্যা। কথায় আছে না- যেখানে বাঘের ভয় সেখানে সন্ধ্যা হয়। ঠিক তেমনটা হলো। জায়গাটা এই গ্রামের এককালীন রাজ মিঃ টমাস গোমস এর কবর খানার খুব কাছে। তাকে নাকি কেউ হত্যা করেছিল। এই সব চিন্তার মাঝে মিকু বলল, ভাইয়া চল আমরা সামনে যাই, যদি কোন ঘর-বাড়ি পাওয়া যায়। মিতুল এতক্ষণ বসে ছিলো। কখন উঠে বলল সে, চল যাই কাঠুরের কুটিরও পেতে পারি। এটাই আমাদের সামনে এখন একমাত্র উপায়। না জানি এই ঝড়ঝঞ্জাটের দিনে বাবা-মা আমাদের না পেয়ে কী করছে।
সবাই এই কথায় রাজি। আমরা আবার হাঁটা ধরলাম। আকাশের পা থেকে কাঁটা বের করে ফেলা হয়েছে এক ফাঁকে। কিছুক্ষণ হাঁটার পর বাতাসের আওয়াজ আর মুশলধারে বৃষ্টির মধ্যে দিয়ে উচ্চস্বরে কিছু মানুষের কথা শুনতে পেলাম। জাহাজডুবি যাত্রী যেমন খরকুটা আঁকড়ে ধরে বাঁচার চেষ্টা করে, তেমনি আমরাও দে-ছুট সেই শব্দ লক্ষ্য করে। ডালপালা, পিচ্ছিল কাঁদা-মাটি, বজ্রপাত সব ঠেলে হাঁপাতে-হাঁপাতে যেখানে এসে পোঁছালাম, সেটা হলো সেই পুরান রাজবাড়ির। মিথুন বললো এ কীরে! আসিফ, এ কোথায় এলুমরে? চিকু বললো, একি দাদা এতো দেখি রাজ বাড়ি! আমরা কি তবে আর কোনো দিন বাড়ি ফিরতে পারবো না? ভূতের হাতে মারা পড়বো? টিংকু বললো, এখন কি হবে দাদা? আকাশ বললো কিচ্ছু হবে না। ভূতের উপর আমার ডিগ্রি আছে। আমি বললাম, তোর কি এখনো মজা করতে মন চায়? ও বললো, ঠাকুরমার ঝুলিতে ভূত এভাবে কথা বলতো? গাধা, এগুলো মানুষ। হয়তো ঝড়-তুফানে এখানে আটকা পড়েছে। চল যাই, ভুত হলেও আধুনিক যুগের ভুত। মোবাইল আব্যশই আছে। চল ঐখানে, আবশ্যই বাড়িতে খবর দেওয়া যাবে। চল যাই।
বাড়িটির খুব কাছে গিয়ে দেখি চারদিকে মশাল জ্বালানো। আড়াল থেকে  ভিতরের লোকগুলোকে দেখতে একেবারে আলিবাবা চল্লিশ চোর এর ডাকাতের মত লাগছে। ওরা সবাই কি এক বিষয় নিয়ে কথা বলছে। আকাশ বললো লোকগুলোকে সুবিধার মনে হচ্ছে না। চল কী বলে শুনি।
ওস্তাদ, মাস্টারটা আজ টাকা তুলেছে। কানু ফোন করেছে শহর থেকে। কানু ওই ব্যাটার পিছু নিয়েছে। ঝড়ের কারণে কোথায় নাকি বসে আছে, ঝড় থামলে রওয়ানা দিবে। আজ রাত ১১টার সময় এই পথে আসবে ওরা। মাস্টারের সাথে একটা লোক আছে।
সমস্যা নাই, তোরা রেডি থাক। মাষ্টার মশাইকে আজ বলী দেবো ওদের ৫০ জনের মতো, যারা ভূতের হাতে মরেছিল। এবারও চামুন্ডা ভুত ওদের মারবে।
চাচাচামু......ন্ডা, সেই বিখ্যাত ডাকাত! আগে তো ছিলো ভুত, এখন তো দেখি সাক্ষাৎ যম। চল পালাই না হলে চিকেন তান্দুরি বানায়া ফেলবো। আমি বললাম, থাম তোরা। মাষ্টার দাদু কে বাঁচাতে হবে। তোরা কাছাকাছি কোথাও লুকিয়ে বসে থাক। আমি আর আকাশ গ্রামে গিয়ে মানুষ ডেকে আনি। আর পুলিশকেও বলবো যে এখানের সব খুন চামুন্ডা ও তাঁর লোকেরা করেছে। রাজার ভূতে কিছু করেনি। মিথুনকে মিকু, চিকু, টিংকুর সাথে রেখে গেলাম।
আমরা দিলাম ছুট। একনাগাড়ে অন্ধের মতো দৌড়াতে দৌড়াতে কিভাবে যে গ্রামে পোঁছালাম! কতক্ষণ দৌড়ালাম জানিনা। আমাদের দু বন্ধুর পা তখন কাঁটা ডাল এর আঘাতে কেটেকুটে গেছে। পরিশ্রম এর কারণে কথা বলতে পারছিলাম না।
আমাদের মা-বাবারা সবাই কাঁদছে বসেবসে। আমাকে দেখে তাদের খুশি ধরে না। আমার বাবাকে সব কথা বললাম। বাবা সব শুনে গ্রামের মানুষ ও পুলিশকে খবর দিলেন। গ্রামের মানুষ পুলিশ নিয়ে চামুন্ডাকে ও তার ডাকাত বাহিনিকে ধরলো।
আমরা ডাকাতদের শুনতে পাওয়া সব কথা পুলিশকে বললাম। অবশেষে কাঞ্চনপুর গ্রামের পঞ্চাশ খুন মামলার জট খুললো। মাষ্টার দাদুও বেঁচে গেল। আমাদের নামে সব পত্রিকায় নিউজ হলো। আমাদের পুলিশের পক্ষ থেকে পুরষ্কৃত করা হলো। মাস্টার দাদু আমাদের মাঝে মাঝে পড়াতে আসেন। এখন গ্রামের অনেক লোক আমাদের কাছে প্রায়ই কেস নিয়ে আসে। আমরা নাকি গোয়েন্দা বনে গেছি।

No comments

Post a Comment