Monday, May 30, 2016

গল্প | পরীর স্মৃতি || ছায়াপথ ওয়েবম্যাগ

| মিনহাজ ফয়সল | আজ অভির ভীষণ মন খারাপ। বিষন্ন মন নিয়ে প্রতিদিনের মতো আজও অভি তার বারান্দায় পায়চারি করছে আকাশের তারার সাথে কথা বলতে। ক... thumbnail 1 summary

| মিনহাজ ফয়সল |


স্মৃতি - মিনহাজ ফয়সল

আজ অভির ভীষণ মন খারাপ। বিষন্ন মন নিয়ে প্রতিদিনের মতো আজও অভি তার বারান্দায় পায়চারি করছে আকাশের তারার সাথে কথা বলতে। কিন্তু আজ যেন তারাগুলোও তার সাথে লুকোচুরি খেলছে। এক সময় এই তারারাই ছিলো তার সকল সুখ-দুঃখের সঙ্গী। অথচ আজ তারাও বেঁকে বসেছে। তারারাও আজ অভির উপর মন খারাপ করে আছে। অভির কথায় সাড়া দিচ্ছে না তারা। অভি জানে একদিন কেউ আর তার কথায় সাড়া দিবে না। অপরাধবোধ আজ ভীষণ ভাবে নাড়া দিচ্ছে অভির মনে। স্মৃতিগুলো আজ পেছন তাড়া করছে ভীষণ। কোনভাবেই অভি সেই স্মৃতিগুলোকে পেছনে ফেলে সামনে এগুতে পারছে না আর। স্মৃতিচারণেরও সময় হয়ে উঠেনি তার। অথচ আজ সে সেই স্মৃতির পাতাগুলোকে এড়িয়ে যেতে পারছে না কোনোভাবে।

ইদানিং প্রতিটা মুহূর্তে একটি প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় অভিকে।  বিয়েটা এখনো করা হয়নি কেন তার? বয়স তো কম হল না। পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই করছে। এ প্রশ্নের কোন উত্তর যে তার কাছেও নেই সেটা সে কাউকে বোঝাতে পারে না । কোন অনুষ্ঠানে কিংবা ব্যক্তিগত কাজের কোন মিটিং-এ কোথাও গিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারে না সে। পৃথিবীতে এতো কিছু থাকতে এই একটা প্রশ্নই কেন আজ অভিকে এতোটা অস্থির করে রাখছে সে তা জানে না। পরিবারের কাছেও সে নিরুত্তর। বিয়ের ব্যাপারে এতো চাপ তার আর ভালো লাগে না ।

মনে পড়ে যায় তার ছাত্রজীবনের কথা। উচ্চমাধ্যমিক পাশের পরই গৃহশিক্ষক হিসেবে কাজ শুরু করে অভি। কাজের সুবাদে অনেক ছাত্রকেই পড়াতে হতো তার। অনেকটা পেশা হয়েই দাঁড়িয়েছিল প্রাইভেট টিউশনটা। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলেও এসএসসি পরীক্ষার্থী পরীকে পড়াতে গিয়েই তার জীবনের মোড়টা ঘুরে গেলো অন্যদিকে। দিন দিন পরির প্রতি দুর্বলতা বাড়তে থাকলো। ধীরে ধীরে অভি বুঝতে পারলো পরীও তাকে ভালবাসে।

যতোই দিন যাচ্ছিলো পরীর প্রতি অভির অনুভূতিগুলো যেন আরো গভীর হচ্ছিলো। বিরামহীন ভালোলাগায় মগ্ন তখন অভি। নিজের ভালোলাগা ভালোবাসার অনুভূতিগুলোকে আরও গভীরভাবে প্রকাশের জন্য একটা সময় অভি কলম হাতে তুলে নেয়। পরীকে তিল তিল করে ভালোবেসে ফেলার সমস্ত প্রকাশ উঠে আসলো তার কলমের আঁচড়ে। পরীকে বোঝানোর সাথে সাথে আরো বেশী করে অনুধাবন করানোর জন্যে কলমটাই বেছে নিয়েছিল অভি। সে তাঁর সমস্ত সত্ত্বা দিয়ে ভালোবাসতো পরীকে। তার যতো কবিতা লেখা হতো সব পরীকে নিয়ে। দিন যেতে যেতে লেখালেখি যেন তার অভ্যাসে পরিণত হয়ে উঠলো।
এদিকে পরীর অনেক প্রত্যাশা অভির প্রতি। অভিও সেটা পূরণ করার চেষ্টা করতো। তার যতটুকু সামর্থ আছে ততোটুকু থেকে কখনো বঞ্চিত করেনি অভি; প্রতিটা মুহূর্তে প্রত্যাশা থেকে বেশি কিছুু দেয়ার প্রচেষ্টা থাকতো তার। দিন যাবার সাথে সাথে তাদের সম্পর্ক আরো গভীর হচ্ছিল। সম্পর্কে কোন বাধা আসেনি তখনো। এভাবেই চলছিল তাদের।

একটা সময় অভি লেখালেখি নিয়ে বেশ ব্যস্ত হয়ে পড়ে। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় পরীকে নিয়ে তার লেখাগুলো প্রকাশ হতে থাকলো। এদিকে যাকে নিয়ে তার এই লেখালেখির জগতে আসা, তাকে আগের মতো সময় দেয়া হচ্ছে না অভির। অথচ একটা মুহূর্তের জন্যও মনের অগোচর করতে পাওে না পরীকে। সারাক্ষণ মনে বিরাজ করে তার মনমানসী পরী। তার প্রতিক্ষণের ভাবনা জুড়ে শুধু পরী। কিন্তু সময়ের অভাবে যোগাযোগটা অনেক কমে আসে তাদের। অভিমানী পরী এই কমটুকুও সহজে মনে মেনে নিতে পারেনি। তবুও অভি আর আগের মতো সময় দিতে পারে না তার পরীকে। ধীরে ধীরে অভি লেখক হিসেবে অনেক পরিচিতি লাভ করে; অল্প সময়ে অনেক সুনাম ছড়িয়ে পড়লো অভির। অভি নামটা হয়ে উঠলো  তরুণ লেখক সমাজের এক পরিচিত নাম। খ্যাতি ছড়িয়ে পড়লো চারদিকে।  নাম, যশ,খ্যাতির পাশাপাশি ভক্তের সংখ্যাও বাড়তে থাকলো। সব কিছুর শেষে অভির হাতে আর অবশিষ্ট কোন সময় থাকতো না পরীর জন্য। অথচ এই পরীকে নিয়েই তার যত নাম, যশ, খ্যাতির শুভ সূচনা। এই ব্যস্ততার মধ্যে দিয়েই একটা সময় পুরোটাই যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায় পরীর সাথে। প্রতীক্ষার প্রহর গুণতে থাকে পরী। কিন্তু  অভির সান্নিধ্য আর পেল না পরী। প্রচ- অভিমান আর জেদের বশবর্তী হয়ে একটা সময় জীবনের সব থেকে মূল্যবান সিদ্ধান্তটা নিয়ে ফেলে পরী।
পরিবারের পছন্দে বিয়ের পিঁড়িতে বসে যায় পরী। তবুও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করেছিল অভির জন্যে। অভি আসেনি। নিয়ম মতো সে তার লেখালেখির জগতে মহাব্যস্ত হয়ে থাকে। পরীর ধারনা অভি হয়তো ভুলে গেছে পরী নামটাই।

স্মৃতি - মিনহাজ ফয়সলএকটা সময় সম্বিত ফিরে পায় অভি। সময়ের আবর্তে ভুলে যাওয়াটা স্বাভাবিক হলেও, অভি ভুলে যায়নি তাকে। তার হৃদয় জুড়ে শুধুই পরী। তার প্রতিটা লেখার কেন্দ্রীয় চরিত্র সে; সেই পরীকে কি করে ভুলবে অভি? এদিকে পরী সংসার জীবনে পা রাখলেও পারেনি ভুলে যেতে তার অতীত জীবন। একটা মুহূর্তও থাকতে পারে না অভিকে নিয়ে না ভেবে। জেদ আর অভিমান পরীকে সুখ দিতে পারবে না জেনেও পরী ঐ মুহূর্তে কঠিন সিদ্ধান্তটা নিতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু আজ প্রতিটা মুহূর্তে উপলদ্ধি করে অভির ভালোবাসা। সুখ নামক অলীক বস্তুটি ধরা দেয়নি পরীর কাছে। অভি জানে তার পরী সুখে নেই; তবু তো আছে একজনের ছায়ার নিচে। এ কথা ভেবে কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে সে আজ।

অনেক বছর কেটে গেছে এর মধ্যে; আজও বিয়ে নামক ঐ নৈতিক বন্ধনে আবদ্ধ হয়নি অভি।
অভির মন আজও পড়ে আছে পরীর কাছে। পরী চলে গেলেও অভি তো মন থেকে আজও পরীকেই ভালোবাসে; মুছে ফেলতে পারেনি পরীর কোন স্মৃতি। কিন্তু আজ অভি সবাইকে বোঝাতে অক্ষম যে সে কেন তার ভালোবাসার স্বাধীনতাটুকু হারাতে চায় না।
সাহিত্য জগতে অভির খ্যতির শেষ নেই। তবু আজও একাকী জীবন যাপন করছে সে। পরীর দেয়া ভালোবাসা আজও লালন করে দিনাতিপাত করছে অভি। বিষণœতায় বিভোর অভি এখন প্রতি রাতে এই বিশাল আকাশের মাঝে তার চির চেনা তারাদের সাথে কথোপকথনে মগ্ন থাকে।
পরীকে ভুলে যেয়ে অভি চায় না আবার নতুন কোন সম্পর্কে জড়াতে; চায় না নতুন কাউকে ভালোবেসে পরীর স্মৃতিটুকু জীবন থেকে মুছে ফেলতে। অভি চায় যতো দিন বেঁচে থাকবে, এভাবে একাকী নির্বিঘ্নে তার মন-মানসীকে ভালোবেসে যেতে।

No comments

Post a Comment