| খান মেহেদী মিজান |

বিনোদপুর গ্রাম। কীর্তিনাশার পাড় ধরে সবুজ বনানীর ছায়া ঘেরা পরিবেশে গ্রামখানি। একসময় কীর্তিনাশার বুকজুড়ে জোয়ার-ভাটার তীর ছাপানো প্রমত্ততা থাকলেও নদীটির মোহনা মরে গিয়ে এখন মরাগাঙে রূপ নিয়েছে। তাই কেউ কেউ মরা নদীকে মরাগাংপাড় বলে উল্লেখ করে থাকে। এখানকার মানুষগুলো খুবই সহজ-সরল। কৃষি কাজের মাধ্যমে গায়ে খেটেই জীবিকার সন্ধান করে থাকে। স্থানীয় গয়াতলা হাট বা বাজার নামে সপ্তাহে দুদিন বিকেল বেলা বেচাকেনার পসরা বসে। সেখান থেকেই বাকী কয়দিনের নিত্যপ্রয়োজনীয় সওদাপাতী কিনে থাকে গ্রামবাসী। হাটবার ছাড়া মেহমান এসে পড়লে বাড়িতে পালিত হাঁস-মুরগী ও গাভীর দুধ দিয়েই মেহমানদারী করানো হয়। এছাড়া বাড়ীর আঙিনায় ফলানো ও আশপাশের ক্ষেতের আইল থেকে তুলে আনা শাক-সবজি দিয়েই পেটে ভাত দিতে হয় নিজেদের। তবে বেশ কয়েক বছর যাবৎ এলাকার চেয়ারম্যানের সহযোগিতায় বিদ্যুত সংযোগ পাওয়ায় এবং কিছু লোক মধ্যপ্রাচ্যে থাকার কারণে দুই-এক বাড়ীতে ফ্রিজ এসেছে ইতোমধ্যে। এবং সেসব বাড়ীতে ধরনা দিয়ে প্রতিবেশিরা মেহমানদের জন্য দু’এক পোটলা মাছ-মাংস রেখে দেয়। অবশ্য এজন্য কম গোঙানী শুনতে হয় না।
কিন্তু হাতে গোনা হলেও এখানকার বেশ কয়েকটি পরিবার শিক্ষা-দীক্ষার সুযোগ পেয়ে ঢাকা শহর এবং বিদেশে চাকরী ও ব্যবসা-বানিজ্য করে শিল্পপতি বনে গেছে। রাজধানীতে বিলাস বহুল বাড়ি-গাড়ি করে সুখেই জীবন পার করছেন। তবে এদের মধ্যে অনেকেই গ্রামে ফিরে না। কিন্তু তরুণ শিল্পপতি আবদুল হামিদ সাকিদার দেশ-বিদেশে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বিলাস বহুল বাড়ি-গাড়ি রেখেও শৈশব স্মৃতি ও মাটির টানে গ্রামে ফিরে আসেন বার বার। এমনকি গ্রামে একটি বিশাল বাগান বাড়িও করেছেন প্রকৃতির নির্মল বাতাস সেবন ও গ্রামের সহজ-সরল মানুষের মাঝে নিজেকে মিলিয়ে বিলিয়ে দেয়ার জন্য। এমনকি কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে নিন্ম আয়ের মানুষগুলোর ভাগ্যের চাকা কিভাবে ঘুরানো যায়, এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে শিক্ষার হার বাড়ানো এবং চিকিৎসা সুবিধা বৃদ্ধির জন্য একটি হাসপাতাল ও একটি বৃদ্ধাশ্রম করার পরিকল্পনা তার মাথায় দীর্ঘদিন যাবৎ ঘুরপাক খাচ্ছিল। আর এ ব্যাপারটি তিনি এলাকার সর্বজনগ্রহণযোগ্য ব্যক্তি মাষ্টার মিজান খানের সাথে আলোচনাও করেছেন। মাষ্টার মিজান খান তার এসব ভালো চিন্তার প্রস্তাবগুলোকে জনকল্যাণ মনে করে সাধুবাদ জানান এবং সুযোগ পেলে নিজেকে সম্পৃক্ত করার আশ্বাসও দিয়েছেন।
হামিদ সাহেব বছরে দুটি ঈদ উৎসবে ছুটে আসেন গ্রামের মানুষের টানে। দু’হাতে বিলাতে থাকেন জামা-কাপড়, খাবার সামগ্রী এমনকি নগদ টাকা। গ্রামের হতদরিদ্র মানুষগুলি হামিদ সাহেবকে পেয়ে যেন স্বর্গীয় চাঁদকে নিজেদের মাঝে পেয়েছে। তারাও নিজেদের সরল হৃদয়ের সবটুকু ভালোবাসা দিয়ে তাঁকে গ্রহণ করেছে। একসময় সমাজের কিছু স্বচ্ছল সমাজপতিরাও হামিদ সাহেবের কাছে ভিড়তে লাগল। কেউ ভাবল আমরাও কিছু সুযোগ গ্রহণ করিনা কেন। আবার কেউ ভাবে এমন উদার দানশীল ব্যক্তিকে আমাদের এলাকার জনপ্রতিনিধি বানাতে পারলে সমাজ উন্নয়নের মুখ দেখত। পিছিয়ে পড়া এ এলাকার রাস্তা-ঘাট, ব্রিজ, বিদ্যুৎ সহ সকল প্রকার উন্নয়নের ছোঁয়ায় ঘুরে দাঁড়াত এলকা।
লোকজনের এসব প্রস্তাবিত কানাঘুষো হামিদ সাহেবের কানে পৌঁছে গেল। তাই একটি ঈদে দরিদ্রদের মাঝে অর্থ-সামগ্রী বিতরণের পূর্বে মাষ্টার মিজান খানকে ডাকলেন এবং এসব ব্যাপারে শেয়ার করলেন। অবশ্য এর আগে কোনো উৎসব ধরে মাষ্টার সাবকে এভাবে ডাকেননি এবং মাষ্টার সাবও এসব থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতেন। এতদিন অবশ্য দূর থেকে তার দান করার কথা শুনেছেন, তবে এবার কাছে থেকে নিজ চোখে দেখলেন এলাহীকাণ্ড। জামা-কাপড় ও খাদ্যসামগ্রীর সাথে সুবিধাভোগীরা হামিদ সাহেবকে পটকিয়ে বান্ডেল বান্ডেল কড়কড়া নোট হাতিয়ে নিচ্ছে। এতে অবশ্য হামিদ সাহেব আত্মতৃপ্তি পাচ্ছিলেন। কারণ এযাবৎ শহরের যে মানুষগুলোকে খাইয়েছেন দিয়েছেন তারা একবার নিয়ে গেলে ঘুরে এসে সালামটুকু পর্যন্ত দেয় না। আর নিজ এলাকার এসব সহজ-সরল মানুষগুলো বছরের এক ঈদে কিছু পেলে আরেক ঈদ পর্যন্ত গুন-গান গাইতে থাকে। পথে পথে সালাম ঠুকে, জি স্যার-জি স্যার করতে থাকে। এ কি কম পাওয়া! আর আল্লাহ তো তাঁকে অনেক দিয়েছে। ঠিকমত হিসাবে করে যাকাত-ফেতরা দিলেও এলাকার মানুষগুলো অন্তত বছরে দুটি উৎসব ভালোভাবে পালন করতে পারে।
কিন্তু কিছু চতুর লোকের টাকা হাতিয়ে নেয়ার ব্যাপারটি মাষ্টার সাবের কাছে ভালো লাগেনি। তাই তিনি মনে করেন এতে করে গরিবদের ভাগ্যের চাকা ঘুরছেনা। পরিবার নিয়ে চলার মত আয়-উপার্জনের পথ হচ্ছেনা। তাই এবারের উপকরণ বিলি বন্টনের পর মাষ্টার সাব হামিদ সাহেবের সাথে কিছু পরামর্শ শেয়ার করলেন। অবশ্য এরই মাঝে এলাকাবাসী তাঁকে চেয়ারম্যান নির্বাচিত করেছেন। এতে তিনি জনগণের প্রতি আবেগ-আপ্লুত।
মাষ্টার সাব বয়সে চেয়ারম্যান হামিদ সাহেবের অনেক ছোট হওয়ায় চেয়ারম্যান দাদা বলেই ডাকেন। চেয়ারম্যান সাহেবও মাষ্টারকে ভালোবাসেন ও স্নেহভরে ডেকে থাকেন।
মাষ্টারঃ চেয়ারম্যান দাদা, সুযোগ দিলে আপনার সাথে কিছু বিষয় পরামর্শ করতাম।
চেয়ারম্যানঃ কি বল মাষ্টার, তুমি যেকোনো বিষয় নিয়ে খোলামেলা আলাপ করতে পার। তো বল কি তোমার আসল কথা?
মাষ্টারঃ বলতে চাচ্ছিলাম যেভাবে মানুষকে দিচ্ছেন, খাওয়াচ্ছেন সত্যিই প্রশংসনীয়। তবে আমার পরামর্শ হল শুধু উৎসব ধরে এদের যতই খাওয়ান-পরান এতে এদের সার্বিক ভাগ্যের উন্নয়ন ঘটছে না।
চেয়ারম্যানঃ তাহলে তুমি বল কিভাবে করলে ভালো হয়।
মাষ্টারঃ এই ধরুন বিভিন্ন এলাকা থেকে হতদরিদ্র লোক বাছাই করে তাদের মধ্যে দৈনিক উপার্জন করার মত কিছু যানবাহন যেমনঃ রিক্সা, ভ্যান জনপ্রতি একটা না হলেও প্রতি দুইজনে একটা করে কিনে দিলে এর মাধ্যমে তারা দৈনিক উপার্জনে সংসার চালিয়ে বাড়তি কিছু সঞ্চয়ও করতে পারবে। আবার দরিদ্র মেধাবী ছাত্রদের বৃত্তি, ভর্তি ও বই-পুস্তকের সুযোগ করে দিলে শিক্ষার হার বাড়বে।অপরাধ কমবে।
চেয়ারম্যানঃ মাষ্টার তোমার পরামর্শ অত্যান্ত সুদূরপ্রসারী। এর আগে এভাবে কেউতো বলেনি! আমি তোমার প্রস্তাবে একমত। এবং তুমি পরামর্শ দিয়ে পাশে থাকলে আমি সমাজ ও মানুষের কল্যাণে কাজ করে যাব। এতে চেয়ারম্যান হওয়াটা মূখ্য বিষয় নয়। তোমাদের মত শিক্ষিত ভালো মনের মানুষদের নিয়ে সমাজের পরিবর্তন ঘটাতে চাই।
মাষ্টারঃ আসলে আমি বা আমরা যারা মাষ্টারি করি; মানুষ গড়ার কারিগর বললেও এ স্বল্প আয়ের মানুষদের কেউ সামাজিক কাজে, সালিশ-দরবারে ডাকে না। সে যাই হোক, আপনি ডাকলে ভালো কাজে শরিক হবো।
চেয়ারম্যানঃ আমারও কিছু পরিকল্পনা আছে। বাস্তবায়নও করতে চাই। যা তোমার সাথেও আলাপ করেছি আগে। এ পশ্চাৎপদ জেলায় শিশুদের মানশিক বিকাশে কোনো পার্ক-উদ্যান নেই। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষে বর্তমান সরকারের বড় উদ্যোগ পদ্মাসেতু নির্মাণ। সেতু নির্মিত হলে এখানকার কৃষকরা তাদের উৎপাদিত টাটকা শাক-সবজী সহ নিজেদের শ্রমও রাজধানীতে নিয়ে গিয়ে ন্যায্য মূল্যে বিক্রি করতে পারবে। তাই আমি একটি এ্যগ্রোফার্ম করার পরিকল্পনা করতেছি যেখানে কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে। এতে করে ঢাকামুখী লোকজন মাটির টানে গ্রামে এসে কাজ করে সাবলম্বী হতে পারবে।
তবে সার কথা তোমার পরামর্শ কাজে লাগিয়ে এবার ঈদের আগেই দরিদ্র পরিবারের মাঝে কিছু রিক্সা-ভ্যান কিনে দিয়ে যাবো। যাতে ঈদে বেড়াতে এসে দেখি তারা উপার্জনের নেমে পড়েছে। এমনকি এলাকার মধ্যে আমি দামী গাড়ীতে না ঘুরে তাদের রিক্সা-ভ্যানে চড়বো এবং ভাড়া মিটিয়ে দেব। এতে তারাও খুশি হবে।
আর শোন মাষ্টার, সরকার একটি বাড়ি একটি খামার ঘোষণা করেছে। এটা বাস্তবায়নে এলাকায় শিক্ষিত মেয়ে ও নারীদের নিয়ে তোমাকে কাজ করতে হবে। আগে দেখেছি মা-চাচীরা বাড়ির আঙিনায়, আশপাশে তরকারী গাছ লাগিয়ে নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে বিক্রিও করেছে। আজ এসব সবজি কিনে খেতে হয়। এ অভ্যাস বদলাতে হবে।
মাষ্টারঃ জি, চেয়ারম্যান দাদা, উঠোন বৈঠক ও গ্রাম্য সভায় এসবসহ যৌতুকপ্রথা ও বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে গ্রামবাসীকে বুঝাবো এবং জনপ্রতিনিধি নির্বাচনে উৎকোচ-উপঢৌকন না নিয়ে সৎ, যোগ্য ও দেশপ্রেমিক প্রার্থীকে নির্বাচিত করার পরামর্শও দিব।
লেখক : শিক্ষক, সাংবাদিক ও কবি